ডায়াবেটিস ধান চাষে নতুন দিগন্তের সূচনা: কৃষক জাকিরের সফলতার গল্প
ডায়াবেটিস ধান চাষে নতুন দিগন্তের সূচনা: কৃষক জাকিরের সফলতার গল্প
বাংলাদেশের কৃষি খাতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষকদের ভাগ্য বদলানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এমনই এক চমকপ্রদ উদাহরণ তৈরি করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের খানপাড়া গ্রামের কৃষক মো. জাকির খান। তিনি দেশের প্রথম সারির কৃষকদের একজন হয়ে উঠেছেন ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপযোগী এক বিশেষ ধানের জাত ‘ব্রি-১০৫’ চাষ করে।
শুরুটা কেন এবং কীভাবে
জাকির খান একজন প্রথাগত কৃষক, যিনি বহু বছর ধরে নানা ধরনের ধানের চাষ করে আসছিলেন। তবে তাঁর জীবনে এক মোড় আসে যখন তিনি নিজেই ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হন। নিজের স্বাস্থ্যগত সীমাবদ্ধতা থেকেই তার আগ্রহ জন্মায় এমন ধান চাষে, যেটা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জানতে পারেন ‘ব্রি ধান ১০৫’ নামের একটি বিশেষ ধান জাত সম্পর্কে, যা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবন করেছে। এই ধানটি কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) সম্পন্ন, অর্থাৎ এটি খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রি-১০৫ ধানের বৈশিষ্ট্য
‘ব্রি ধান ১০৫’ হলো একটি উচ্চফলনশীল ধান, যার জীবনকাল প্রায় ১৪৮ দিন। এর চাল মাঝারি লম্বা এবং চিকন, ভাত রান্না করলে ঝরঝরে ও সুস্বাদু হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক কম। সাধারণত GI মান যদি ৫৫ বা তার নিচে হয়, তাহলে সেটিকে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ ধরা হয়। ব্রি-১০৫ এর GI এই সীমার মধ্যে থাকায় এটি একটি স্বাস্থ্যবান্ধব খাদ্য হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরীক্ষামূলক চাষে দেখা গেছে, এই ধান প্রতি হেক্টরে ৭.৮ থেকে ৮.৫ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে। পাশাপাশি এটি দেশের আবহাওয়ায় বেশ সহনশীল এবং নিয়মিত ধান চাষের পদ্ধতিতেই এটি চাষ করা যায়। অর্থাৎ নতুন কোনও অতিরিক্ত প্রযুক্তি বা জটিলতা ছাড়াই চাষিরা এই ধান ফলাতে পারেন।
জাকির খানের সফল চাষ ও প্রভাব
২০২৫ সালের বোরো মৌসুমে কৃষক জাকির খান এক একর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্রি-১০৫ ধান চাষ করেন। তিনি নিজেই বলেন, “আমি ডায়াবেটিস রোগী হওয়ায় নিজের জন্য নিরাপদ খাদ্য খুঁজছিলাম। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে এই ধান চাষ করি। ফলন খুব ভালো হয়েছে এবং স্বাদেও বেশ ভিন্নতা রয়েছে।”
তার খেতে ধান দেখতে প্রতিদিন বহু মানুষ আসছেন। কেউ কেউ ধানের বৈশিষ্ট্য জেনে নিজের জমিতে চাষের আগ্রহ প্রকাশ করছেন। এমনকি আশপাশের অনেক কৃষক তার কাছ থেকে ধানের বীজ সংগ্রহের আগ্রহও দেখিয়েছেন। জাকির খানের এই সাফল্য কেবল তাকে নয়, গোটা এলাকাকেই উৎসাহিত করেছে।
কৃষি বিভাগ ও সরকারের ভূমিকা
গোমস্তাপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. তানভীর আহমেদ সরকার বলেন, “এই ধান শুধুমাত্র ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপযোগী নয়, সাধারণ মানুষও এটি খেতে পারেন। এর ফলন ভালো, রোগবালাই কম, এবং পুষ্টিমূল্যও বেশি।” তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগ চাষিদের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বীজ সরবরাহে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
সরকার এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলায় এই ধান চাষ সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে চাষিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, বীজ সরবরাহ করছেন এবং ফলন পর্যবেক্ষণ করছেন।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্ভাবনা
ডায়াবেটিস রোগ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশেও এই রোগের হার দ্রুত বাড়ছে। এ অবস্থায় ‘ব্রি-১০৫’-এর মতো একটি খাদ্যশস্য ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টির মান উন্নয়নেও এটি ভূমিকা রাখবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই ধান চাষ লাভজনক। জাকির খান জানিয়েছেন, “সাধারণ ধানের চেয়ে এই ধানে লাভ বেশি, কারণ এর দাম বেশি পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে আগ্রহ করে কিনতে চায় বলে বাজারে চাহিদা বাড়ছে।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সম্প্রসারণ
জাকির খানের মত চাষিরা যদি আগ্রহী হয়ে এই ধানের চাষ আরও সম্প্রসারিত করেন, তাহলে দেশে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটি বিশাল নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ চেইন তৈরি হতে পারে। বর্তমানে বরিশাল, টাঙ্গাইল, বাগেরহাটসহ কয়েকটি জেলায় এই ধানের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়েছে এবং সেখানেও ফলন ভালো হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা আশা করছেন, আগামী পাঁচ বছরে ব্রি-১০৫ ধান দেশের প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে পড়বে। আর যদি সরকার এই ধানের উৎপাদন ও বিপণনে বিশেষ প্রণোদনা দেয়, তাহলে এটি দ্রুত একটি সফল অর্থনৈতিক কৃষিপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
সাবধানতা ও চ্যালেঞ্জ
তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্রি-১০৫ এখনো বাণিজ্যিকভাবে খুব বিস্তৃত নয়। এই ধানের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ সঠিকভাবে না হলে আগ্রহী কৃষকরা চাষ করতে পারবেন না। এছাড়া এটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও বাজারজাতকরণ কৌশলও জরুরি।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। অনেকেই এখনো জানেন না যে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটি আলাদা ধান বাজারে এসেছে। গণমাধ্যম, কৃষি বিভাগ এবং স্বাস্থ্যখাত একত্রে কাজ করলে এটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেতে পারে।
উপসংহার
কৃষক জাকির খানের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত। ব্রি-১০৫ ধান কেবল একটি নতুন ধান জাত নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সচেতনতার প্রতীক। এ ধান শুধু কৃষকদের জন্য লাভজনক নয়, দেশের লাখো ডায়াবেটিস রোগীর জন্য এটি একটি খাদ্য নিরাপত্তার আশা। যদি সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে এ জাতের ধান চাষে সহায়তা করে, তবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যবান্ধব কৃষিপণ্যের নতুন যুগের সূচনা হবে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন